নবাব সিরাজউদ্দৌলার গুপ্তধন: পলাশীর যুদ্ধের পর মীর জাফরের হাতে কী সত্যিই কিছু পড়েছিল
১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর, মুর্শিদাবাদের রাজকোষের ভাগ্য কী হয়েছিল—তা বাংলার ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত এবং কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায়। লোকমুখে প্রচলিত 'নবাবের গুপ্তধন' এবং মীর জাফরের প্রাপ্তির প্রকৃত ঐতিহাসিক সত্যতা নিচে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচনা করা হলো।
মুর্শিদাবাদের রাজকোষের জাঁকজমক ও তৎকালীন বাস্তবতা
পলাশীর যুদ্ধের আগে মুর্শিদাবাদের হীরাঝিল প্রাসাদ এবং রাজকোষ (তোশাখানা) সোনা, রুপা, জহরত এবং মূল্যবান পাথরে ঠাসা ছিল বলে জানা যায়। তবে এটিকে রূপকথার মতো কোনো 'গুপ্তধন' বলা ভুল হবে; এটি ছিল মূলত বাংলার কর ও ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ। তৎকালীন রবার্ট ক্লাইভের ডায়েরি এবং ডাচ ও ফরাসি বণিকদের বিবরণী অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদের রাজকোষের প্রাচুর্য দেখে স্বয়ং ব্রিটিশরাই চমকে গিয়েছিল। ক্লাইভ লিখেছিলেন, তিনি এমন এক শহরের রাজকোষে প্রবেশ করেছিলেন যেখানে সোনা আর রুপার স্তূপ শুধু তাঁদের নেওয়ার অপেক্ষায় ছিল।
মীর জাফরের ক্ষমতাপ্রাপ্তি এবং ব্রিটিশদের সাথে গোপন চুক্তি
নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হটিয়ে মসনদে বসার জন্য মীর জাফর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে একটি গোপন চুক্তি করেছিলেন। এই চুক্তি অনুযায়ী, নবাব হওয়ার বিনিময়ে মীর জাফর কোম্পানিকে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ ও উপহার দিতে বাধ্য ছিলেন। চুক্তির শর্তগুলো ছিল অত্যন্ত চড়া:
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ কোটি টাকা দিতে হবে।
কলকাতার ইংরেজ বাসিন্দাদের ক্ষয়ক্ষতির জন্য আরও ৫০ লক্ষ টাকা দিতে হবে।
রবার্ট ক্লাইভ এবং কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত 'উপহার' বা নজরানা দিতে হবে।
লুণ্ঠনের নির্মম বাস্তবতা: মীর জাফরের হাতে কী অবশিষ্ট ছিল
পলাশীর যুদ্ধের পর মীর জাফর যখন মুর্শিদাবাদের মসনদে বসেন, তখন রাজকোষের নিয়ন্ত্রণ কার্যত চলে যায় রবার্ট ক্লাইভ এবং উইলিয়াম ওয়াটসের হাতে।
কোম্পানির লুণ্ঠন: ক্লাইভ এবং তাঁর বাহিনী রাজকোষের সিংহভাগ সোনা, রুপা ও রত্ন বোঝাই করে প্রায় একশোটি নৌকায় করে কলকাতায় নিয়ে আসে। ঐতিহাসিকদের মতে, সমসাময়িক হিসেবে প্রায় ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকার সম্পদ ইংরেজরা সরাসরি লুণ্ঠন ও উপহার হিসেবে আদায় করে নেয়।
মীর জাফরের শূন্যতা: মীর জাফর ভেবেছিলেন সিরাজউদ্দৌলার কোষাগারে এত টাকা আছে যে ইংরেজদের সব দাবি মিটিয়েও তিনি বিপুল সম্পদের মালিক থাকবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ইংরেজদের প্রথম কিস্তির দাবি মেটাতেই রাজকোষ সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে পড়ে। ফলে মীর জাফরের হাতে ব্যক্তিগত কোনো 'গুপ্তধন' তো দূরের কথা, রাজ্য চালানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থও অবশিষ্ট ছিল না।
রাজকোষ শূন্যতার ঐতিহাসিক পরিণতি
অর্থের এই তীব্র সংকটের কারণে মীর জাফরের শাসনকাল শুরুতেই পঙ্গু হয়ে পড়ে:
সম্পদ বিক্রি ও ঋণ: ইংরেজদের বাকি পাওনা মেটাতে মীর জাফরকে রাজপ্রাসাদের সোনা-রুপার বাসনপত্র, দামি গহনা এবং রাজকীয় আসবাবপত্র বিক্রি করতে হয়েছিল।
জমিদারি হস্তান্তর: নগদ অর্থ দিতে না পেরে তিনি কোম্পানির হাতে কলকাতার দক্ষিণের বিশাল অঞ্চলের (২৪ পরগনা) জমিদারি বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
সৈন্যদের বিদ্রোহ: রাজকোষ শূন্য থাকায় মীর জাফর তাঁর নিজের সৈন্যদের বকেয়া বেতন দিতে পারছিলেন না, যার ফলে সেনাবাহিনীতে তীব্র অসন্তোষ ও বিদ্রোহ দেখা দেয়।
মীর জাফরের প্রাপ্তি বনাম কোম্পানির চক্রান্ত
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পলাশীর যুদ্ধের পর মীর জাফরের ভাগ্য মরীচিকায় পরিণত হয়েছিল। সিরাজউদ্দৌলার যে বিপুল সম্পদের লোভে তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, তার মূল অংশটাই ভোগ করেছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। মীর জাফরের ভাগে পড়েছিল কেবল একটি দেউলিয়া শাসনব্যবস্থা, বিপুল ঋণের বোঝা এবং সৈন্য বিদ্রোহের আতঙ্ক। শেষ পর্যন্ত পাওনা টাকা শোধ করতে না পারায় ১৭৬০ সালে ইংরেজরা তাঁকে মসনদ থেকে নামিয়ে তাঁর জামাতা মীর কাসিমকে বাংলার নবাব বানায়। সুতরাং, মীর জাফরের হাতে কোনো গুপ্তধন আসেনি, বরং তিনি পরিণত হয়েছিলেন ব্রিটিশদের হাতের পুতুলে।
Comments
Post a Comment