নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের নেপথ্যে: ঘসেটি বেগমের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস

 ইতিহাসের পাতায় কিছু চরিত্র চিরকাল খলনায়ক হিসেবেই থেকে যায়। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পেছনে মীর জাফরের নাম সবার আগে আসলেও, পর্দার আড়াল থেকে যিনি মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিলেন, তিনি আর কেউ নন—নবাবের আপন খালা, মেহেরুন্নিসা বেগম, যিনি ইতিহাসে ঘসেটি বেগম নামে পরিচিত। নবাব আলীবর্দী খাঁর এই জ্যেষ্ঠ কন্যা কেবল এক ক্ষুব্ধ নারী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক অত্যন্ত চতুর এবং উচ্চাভিলাষী রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকারী।

ক্ষমতার লোভ ও সিংহাসনের দ্বন্দ্ব

নবাব আলীবর্দী খাঁর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তাঁর তিন কন্যার বিয়ে হয়েছিল তাঁরই তিন ভাইয়ের ছেলেদের সাথে। জ্যেষ্ঠ কন্যা ঘসেটি বেগমের বিয়ে হয় ঢাকার শাসনকর্তা নওয়াজিশ মুহাম্মদ খানের সাথে। নিঃসন্তান ঘসেটি বেগম তাঁর ছোট বোনের ছেলে শওকত জঙ্গকে সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিলেন, যাতে পর্দার আড়াল থেকে তিনি নিজেই ক্ষমতা ভোগ করতে পারেন। কিন্তু আলীবর্দী খাঁ তাঁর কনিষ্ঠ কন্যার পুত্র, তরুণ সিরাজউদ্দৌলাকে পরবর্তী নবাব ঘোষণা করায় ঘসেটির সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

বিপুল ধনসম্পদ ও ক্ষমতার উৎস

ঢাকার শাসনকর্তা হিসেবে নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ঘসেটি বেগম ঢাকার রাজপ্রাসাদ 'মতিঝিল'-এ বসবাস শুরু করেন এবং এই বিশাল ধনসম্পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সিরাজ নবাব হলে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থের ওপর আঘাত আসবে।

সিরাজউদ্দৌলার কঠোর পদক্ষেপ

নবাব হওয়ার পরপরই সিরাজউদ্দৌলা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর খালা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। তাই তিনি একটি অত্যন্ত সাহসী কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। তিনি মতিঝিল প্রাসাদ ঘেরাও করে ঘসেটি বেগমের সমস্ত ধনসম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন এবং তাঁকে মুর্শিদাবাদের রাজপ্রাসাদে কড়া নজরদারিতে (এক প্রকার বন্দি) রাখেন। এই অপমান ঘসেটি বেগম কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তাঁর ভেতরের ক্ষোভ তখন এক চরম প্রতিহিংসায় রূপ নেয়।

মীর জাফর ও ইংরেজদের সাথে গোপন আঁতাত

মুর্শিদাবাদের প্রাসাদে বন্দি থেকেও ঘসেটি বেগম দমে যাননি। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত দেওয়ান রাজবল্লভের মাধ্যমে লর্ড ক্লাইভ এবং মীর জাফরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন। সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য যে গোপন ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছিল, ঘসেটি বেগম তাতে বিপুল অর্থ জোগান দিতে রাজি হন। পলাশীর যুদ্ধের মূল নকশা তৈরিতে তাঁর এই গোপন সমর্থন মীর জাফরদের আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল।

ষড়যন্ত্রের করুণ পরিণতি

ইতিহাসের এক নির্মম সত্য হলো, বিশ্বাসঘাতকতার শেষ পরিণতি কখনো ভালো হয় না। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ঘসেটি বেগম ভেবেছিলেন তিনি হয়তো তাঁর কাঙ্ক্ষিত ক্ষমতা ফিরে পাবেন। কিন্তু মীর জাফর বা ইংরেজরা কেউ তাঁকে গোণায় ধরেনি। উল্টো মীর জাফরের পুত্র মিরন ঘসেটি বেগমকে এক চরম বিপজ্জনক চরিত্র হিসেবে গণ্য করেন। ১৭৬০ সালে ঢাকার জিনজিরা প্রাসাদ থেকে মুর্শিদাবাদে ফিরিয়ে আনার পথে, মিরনের আদেশে ঘসেটি বেগমকে ধলেশ্বরী নদীতে নৌকা ডুবিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

ঘসেটি বেগমের এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভেতরের শত্রু যদি বাইরের শত্রুর সাথে হাত মেলায়, তবে একটি স্বাধীন দেশের পতন কতটা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

Comments