পলাশী-পরবর্তী লুৎফুন্নেসা বেগম: বাংলার শেষ বেগমের বন্দিত্ব ও একাকীত্বের করুণ ইতিহাস
১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতা হরণের পর, নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের ওপর নেমে এসেছিল অমানবিক নির্যাতন। ইতিহাসের পাতায় নবাবের বীরত্ব ও ট্র্যাজেডি নিয়ে প্রচুর আলোচনা হলেও, পর্দার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী লুৎফুন্নেসা বেগমের দীর্ঘ ৩৪ বছরের একাকীত্ব, বন্দিত্ব ও চোখের জলের ইতিহাস। সমসাময়িক ঐতিহাসিক দলিল ও নথির ভিত্তিতে নবাব-মহিষী লুৎফুন্নেসার পলাশী-পরবর্তী করুণ জীবন নিচে তুলে ধরা হলো।
রাজমহলে বন্দিত্ব এবং মীরনের পাশবিক প্রস্তাব
নবাব সিরাজউদ্দৌলা যখন সপরিবারে ছদ্মবেশে পাটনার দিকে পালাচ্ছিলেন, তখন রাজমহলে মীর জাফরের অনুচরদের হাতে তাঁরা ধরা পড়েন। মুর্শিদাবাদে ফিরিয়ে আনার পর লুৎফুন্নেসার চোখের সামনেই তাঁর চার বছরের কন্যাসন্তান উম্মে জোহরাকে কেড়ে নেওয়া হয় এবং ২রা জুলাই রাতে নবাবকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
নবাবের মৃত্যুর পর মীর জাফরের লম্পট পুত্র মীরন লুৎফুন্নেসার রূপ ও যৌবনে আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু লুৎফুন্নেসা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ঘৃণাভরে মীরনকে বলেছিলেন, *"যিনি হাতির পিঠে চড়েছেন, তিনি কখনো গাধার পিঠে চড়তে পারেন না।"* এই চরম অপমানের প্রতিশোধ নিতে মীরন নবাব পরিবারের নারীদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
ঢাকার জিনজিরা প্রাসাদে দীর্ঘ নির্বাসন (১৭৫৮-১৭৬৫)
মীর জাফর ও ব্রিটিশদের আদেশে ১৭৫৮ সালে নবাবের মা আমেনা বেগম, খালা ঘসেটি বেগম, স্ত্রী লুৎফুন্নেসা এবং কন্যা উম্মে জোহরাকে মুর্শিদাবাদ থেকে জরাজীর্ণ নৌকায় করে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে জিনজিরা প্রাসাদে বন্দি হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তৎকালীন জাঁকজমকপূর্ণ হীরাঝিল প্রাসাদের রানি লুৎফুন্নেসার জীবন জিনজিরা প্রাসাদের অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি হয়ে পড়ে। সেখানে তাঁদের কঠোর নজরদারিতে রাখা হতো এবং বেঁচে থাকার জন্য সামান্যতম খাদ্যসামগ্রী বা ভাতা দেওয়া হতো। এই দীর্ঘ ৭ বছরের বন্দিজীবনে লুৎফুন্নেসা তাঁর চোখের সামনে শাশুড়ি আমেনা বেগম এবং খালা ঘসেটি বেগমকে মীরনের নির্দেশে বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা ডুবিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করতে দেখেন। ভাগ্যক্রমে লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যা সে যাত্রা বেঁচে যান।
মুর্শিদাবাদে প্রত্যাবর্তন এবং খোশবাগের একাকী জীবন
১৭৬৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর লুৎফুন্নেসা এবং তাঁর কন্যাকে ঢাকা থেকে পুনরায় মুর্শিদাবাদে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁর জন্য মাসিক মাত্র ৫০০ টাকা ভাতা বরাদ্দ করে, যা একজন প্রাক্তন বেগমের মর্যাদার তুলনায় ছিল অত্যন্ত সামান্য।
মুর্শিদাবাদে ফিরে লুৎফুন্নেসা আর কোনোদিন রাজপ্রাসাদে পা রাখেননি। তিনি ভাগীরথী নদীর ওপারে 'খোশবাগ' নামক নবাবী কবরস্থানে একটি ছোট ঘরে বসবাস শুরু করেন, যেখানে তাঁর স্বামী নবাব সিরাজউদ্দৌলা চিরনিদ্রায় শায়িত ছিলেন। জীবনের বাকি দিনগুলো তিনি খোশবাগের দেখভাল এবং নবাবের কবরের পাশে বসে কোরআন তিলাওয়াত ও চোখের জল ফেলে কাটিয়ে দেন।
কন্যার অকাল মৃত্যু এবং শেষ বংশধরের করুণ দশা
লুৎফুন্নেসার দুঃখের এখানেই শেষ ছিল না। তাঁর একমাত্র কন্যা উম্মে জোহরাকে মীর জাফরের এক নাতির সাথে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তরুণ বয়সেই উম্মে জোহরা মারা যান এবং লুৎফুন্নেসার কোলে রেখে যান ৪টি এতিম কন্যাসন্তান। বৃদ্ধ বয়সে এই ৪ নাতনিকে লালন-পালন করতে লুৎফুন্নেসা চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হন। তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর জন্য বহুবার আবেদন করলেও কোম্পানি তা প্রত্যাখ্যান করে।
মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া এবং চিরবিদায়
দীর্ঘ ৩৪ বছর একাকীত্ব, শোক এবং দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করার পর ১৭৯৪ সালের নভেম্বর মাসে বাংলার শেষ বেগম লুৎফুন্নেসা চিরতরে চোখ বন্ধ করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, খোশবাগে প্রিয়তম স্বামী নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরণের কাছে (পায়ের নিচে) তাঁকে সমাহিত করা হয়।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে, লুৎফুন্নেসা বেগমের জীবন ছিল ক্ষমতার লোভ এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়া এক নারীর চরম আত্মত্যাগের প্রতীক। প্রাসাদের বিলাসবহুল জীবন থেকে শুরু করে খোশবাগের কবর পাহারা দেওয়ার এই দীর্ঘ জার্নি আজও বাংলার ইতিহাসপ্রেমীদের হৃদয়ে এক গভীর বেদনার জন্ম দেয়।
Comments
Post a Comment