পলাশীর যুদ্ধোত্তর বাংলার এক নৃশংস অধ্যায়: মীরন-এর অত্যাচার ও তার শেষ পরিণতি

 ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, তার পেছনে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা ছিল প্রধান কারণ। কিন্তু এই ইতিহাসের পাতায় আরও এক চরম নিষ্ঠুর ও লোভী চরিত্র লুকিয়ে আছে, সে হলো মীর জাফরের বড় ছেলে—মিরন। পলাশীর যুদ্ধের পর নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের ওপর মিরন যে নির্মম অত্যাচার চালিয়েছিল, তা শুনলে আজও মানুষের গা শিউরে ওঠে। তবে প্রকৃতির বিচার যে কতখানি নির্মম হতে পারে, মিরনের শেষ পরিণতি তারই প্রমাণ।

মিরনের নৃশংস অত্যাচার ও ক্ষমতার লোভ

পলাশীর যুদ্ধে জেতার পর মীর জাফর নবাবের সিংহাসনে বসলেও, পর্দার আড়াল থেকে আসল ক্ষমতার লোভ সামলাতে পারছিল না মিরন। সে জানত, যতদিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা বেঁচে থাকবেন এবং তাঁর পরিবার বাংলায় থাকবে, ততদিন তাদের সিংহাসন সুরক্ষিত নয়। এই ভয় থেকেই মিরন শুরু করে এক চরম পৈশাচিক অধ্যায়:

• নবাব সিরাজউদ্দৌলার হত্যাকাণ্ড: পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর নবাব সিরাজউদ্দৌলা যখন বন্দি হন, তখন মিরনের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ নামের এক ঘাতক ১৭৫৭ সালের ২রা জুলাই নবাবকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে। নবাবের মৃতদেহ হাতির পিঠে চড়িয়ে পুরো মুর্শিদাবাদ শহর ঘোরানো হয়েছিল, যা ছিল মিরনের চরম অহংকার ও নিষ্ঠুরতার বহিঃপ্রকাশ।

• সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের ওপর নির্যাতন: শুধু নবাবকে হত্যা করেই মিরন ক্ষান্ত হয়নি। সিরাজউদ্দৌলার তরুণী স্ত্রী লুৎফুন্নেসা, নিষ্পাপ কন্যাসন্তান, এবং আলীবর্দী খাঁর পরিবারের অন্যান্য নারীদের ওপর সে অমানুষিক নির্যাতন চালায়।

• নদী বক্ষে সলিল সমাধি: মিরনের আদেশে নবাব পরিবারের প্রায় ৭০ জন অভিজাত নারী ও সদস্যকে ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর মোহনায় নৌকো ডুবিয়ে অত্যন্ত নৃশংসভাবে মেরে ফেলা হয়। বাংলার ইতিহাসের অন্যতম এক কালো এবং কলঙ্কিত অধ্যায় এটি।

মিরনের শেষ পরিণতি: প্রকৃতির এক অমোঘ বিচার

মিরনের এই ক্ষমতা আর রক্তের নেশা কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিশ্বাসঘাতক আর অত্যাচারীদের শেষ পরিণতি কখনোই ভালো হয় না। মিরনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

১৭৬০ সালের ৩রা জুলাই নবাব সিরাজউদ্দৌলার হত্যাকাণ্ডের ঠিক তিন বছর পর, মিরন তখন বিহারে মেজর কালাডের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে মিলে শাহ আলমের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে ব্যস্ত ছিল। একদিন রাতে প্রবল ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে সে তার নিজের তাঁবুতে ঘুমোচ্ছিল। ঠিক সেই সময় এক বিকট শব্দে আকাশ থেকে পড়া এক প্রবল বজ্রপাতে মিরন তার তাঁবুর ভেতরেই পুড়ে ছাই হয়ে মারা যায়।

অনেকে মনে করেন, ইংরেজরা নিজেদের স্বার্থে তাকে গোপনে হত্যা করে বজ্রপাতের গল্প সাজিয়েছিল। তবে তৎকালীন লোকমুখে ও ইতিহাসে এটিই প্রচলিত যে, বাংলার সাধারণ মানুষ মিরনের এই আকস্মিক মৃত্যুকে প্রকৃতির এক অমোঘ বিচার এবং নবাব পরিবারের ওপর করা অত্যাচারের অভিশাপ হিসেবেই দেখেছিল। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই অবসান ঘটেছিল বাংলার এই কুখ্যাত খলনায়কের।

Comments