বিশ্বাসঘাতকতার নির্মম পুরস্কার: পলাশীর যুদ্ধের পর মীর জাফরের করুণ পরিণতি ও শেষ জীবন
ইতিহাসের পাতায় একটি নাম চিরকালের জন্য ঘৃণার প্রতীক হয়ে গেছে—মীর জাফর। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে যে বিশ্বাসঘাতকতা তিনি করেছিলেন, তার খেসারত তাকে শুধু মীর মদনের অভিশাপ বা ইতিহাসের পাতায় মীরজাফর গালি খেয়েই দিতে হয়নি; বরং তার শেষ জীবনটা ছিল এতটাই যন্ত্রণাদায়ক, কুৎসিত এবং করুণ, যা শুনলে যেকোনো মানুষের গা শিউরে উঠবে।
নবাবকে ধোঁকা দিয়ে বাংলার মসনদে বসার পর, ঠিক কী ধরণের ভয়ঙ্কর পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল এই কুখ্যাত সেনাপতিকে।
ইংরেজদের হাতের পুতুল এবং চরম অপমান
নবাবকে সরিয়ে লর্ড ক্লাইভের কৃপায় মীর জাফর নবাবের চেয়ারে ঠিকই বসলেন, কিন্তু ক্ষমতা রইল ইংরেজদের হাতে। রবার্ট ক্লাইভ যখন তখন মীর জাফরকে অপমান করতেন। কথায় কথায় ইংরেজদের বিপুল টাকা দিতে গিয়ে মীর জাফরের রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে, নিজের প্রাসাদের সোনা-রুপার থালা-বাসন, এমনকি বেগমদের গহনা বিক্রি করেও তিনি ইংরেজদের পাওনা মেটাতে পারছিলেন না। নবাব হয়েও তিনি ছিলেম মূলত ক্লাইভের একটা 'গাধা' বা 'পোষা গাধা', যার কোনো নিজস্ব সম্মান ছিল না।
ক্ষমতা হারিয়ে নিজের জামাতার কাছেই লজ্জিত
টাকা দিতে না পারায় ইংরেজরা তিন বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৭৬০ সালে মীর জাফরকে লাথি মেরে সিংহাসন থেকে নামিয়ে দেয়। সবচেয়ে বড় উপহাস হলো, তার জায়গায় নবাব বানানো হয় তারই আপন জামাতা মীর কাসিমকে। যাকে মীর জাফর নিজের ছেলের মতো দেখতেন, তার পায়ের নিচে গিয়ে বসতে হলো তাকে। নিজের লোভের কারণে পরিবারের কাছে এবং বাংলার মানুষের কাছে চরম হেয় প্রতিপন্ন হলেন তিনি।
পুত্র মিরনের মৃত্যু এবং মানসিক ভারসাম্য হারানো
মীর জাফরের বড় ছেলে মিরন ছিল চরম নিষ্ঠুর। সিরাজউদ্দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যার আদেশ দিয়েছিল এই মিরনই। কিন্তু প্রকৃতির বিচার ছিল অদ্ভুত। ১৭৬০ সালে এক রাতে তাঁবুর ভেতর হঠাৎ বজ্রপাতে পুড়ে ছাই হয়ে যায় মিরন। একমাত্র জোয়ান ছেলের এই রহস্যময় ও নির্মম মৃত্যু মীর জাফরকে মানসিকভাবে একদম ভেঙে চুরমার করে দেয়। শেষ বয়সে তিনি তীব্র মানসিক অবসাদ ও পাগলামির শিকার হন।
কুষ্ঠ রোগের ভয়ঙ্কর আক্রমণ
মীর জাফরের জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক। তিনি কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হন। সে যুগে এই রোগকে ভগবানের চরম অভিশাপ মনে করা হতো। রোগের তীব্রতায় তার সারা শরীর পচে গলে যেতে শুরু করে। গা থেকে এত দুর্গন্ধ বের হতো যে, তার নিজের বিশ্বস্ত দাস-দাসী, এমনকি স্ত্রীরাও তার কাছে আসতে ভয় পেতেন। যে ক্ষমতার লোভে তিনি নবাবকে হত্যা করেছিলেন, সেই ক্ষমতার প্রাসাদে বসেই একাকী, তীব্র শারীরিক যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ১৭৬৫ সালের ১৭ই জানুয়ারি তিনি মারা যান।
ইতিহাসের শেষ শিক্ষা: কিরীটেশ্বরী মন্দিরের চরণামৃত
লোকমুখে প্রচলিত আছে, মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে মীর জাফরের কুষ্ঠ রোগের যন্ত্রণা যখন সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন তার মন্ত্রী মহারাজা নন্দকুমার মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত কিরীটেশ্বরী মন্দিরের দেবী মূর্তির পায়ের জল এনে মীর জাফরের মুখে দিয়েছিলেন, যাতে তার আত্মা শান্তি পায়। একজন মুসলিম নবাব হয়েও মৃত্যুর মুখে তাকে হিন্দু মন্দিরের চরণামৃত পান করতে হয়েছিল রোগমুক্তির আশায়। কিন্তু কোনো কিছুতেই শেষ রক্ষা হয়নি।
মীর জাফরের পরিণতি প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার লোভ মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতার শেষ পরিণতি সবসময়ই ভয়ঙ্কর ও লজ্জাজনক হয়। প্রকৃতির বিচার থেকে পৃথিবীর কোনো মীর জাফরই কোনোদিন পার পায়নি, আর পাবেও না।
Comments
Post a Comment