মুঘল সাম্রাজ্যের আগমন (পর্ব ১): পানিপথের প্রথম যুদ্ধ এবং ভারতে বাবরশাহের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা

ইতিহাসের পাতায় ১৫২৬ সালের ২১শে এপ্রিল একটি সাধারণ দিন হতে পারত। কিন্তু দিল্লির কাছে পানিপথের মাঠে সেদিন যা ঘটেছিল, তা ভারতের ইতিহাসকে পুরোপুরি উল্টে দিয়েছিল। চলুন ধাপে ধাপে জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে মধ্য এশিয়ার এক যাযাবর রাজপুত্র ভারতের ভাগ্যবিধাতা হয়ে উঠলেন।

শুরুটা যেখানে: বাবরের পটভূমি ও তাঁর সংকট

ঘটনার শুরু কিন্তু ভারতে নয়, মধ্য এশিয়ায় (বর্তমান উজবেকিস্তানে)। জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ছিলেন তৈমুর লঙ এবং চেঙ্গিস খানের বংশধর। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি ফরগানা রাজ্যের সিংহাসনে বসেন।

কিন্তু বাবর রাজা হলেই তো হবে না, তাঁর নিজের চাচা-মামারাই তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়াল। বাবর তাঁর স্বপ্নের শহর 'সমরখন্দ' তিনবার জয় করেও ধরে রাখতে পারেননি। শত্রুদের তাড়া খেয়ে তিনি নিজের রাজ্য ফরগানাও হারান। একসময় এমন অবস্থা হলো যে, বাবর তাঁর অল্প কিছু অনুসারী নিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।

প্রথম মোড়: কাবুলে ভাগ্যবদল এবং ভারতের দিকে নজর

যাযাবর জীবন কাটাতে কাটাতে ১৫০৪ সালে বাবর একটা বড় সুযোগ পান। তিনি আফগানিস্তানের কাবুল দখল করে নেন। কাবুলের রাজা হওয়ার পর বাবর একটু স্বস্তি পান, কিন্তু তাঁর মন ভরেনি। কাবুল ছিল পাহাড়ি এবং গরিব এলাকা। সেনাবাহিনী চালানোর মতো টাকা সেখানে ছিল না।

ঠিক এই সময়ে বাবর ভারতের ধনসম্পদের কথা জানতে পারেন। তাঁর মনে পড়ে, তাঁর পূর্বপুরুষ তৈমুর লঙ একবার ভারত আক্রমণ করে বিপুল ধনরত্ন নিয়ে গিয়েছিলেন। বাবর বুঝতে পারলেন, মধ্য এশিয়ায় তাঁর আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তাঁর ভাগ্য লুকিয়ে আছে ভারতের মাটিতে।

ভারতের পরিস্থিতি: ইব্রাহিম লোদির ভুল এবং বাবরের কাছে আমন্ত্রণ

এই সময় ভারতের দিল্লির সিংহাসনে বসে আছেন লোদি বংশের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদি। তিনি রাজা হিসেবে বেশ অহংকারী এবং নিষ্ঠুর ছিলেন। নিজের দরবারের আফগান আমির-ওমরাহদের তিনি একদম সম্মান করতেন না। ফলে চারদিকে অসন্তোষ তৈরি হয়।

পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে, পাঞ্জাবের সুবেদার দৌলত খান লোদি এবং ইব্রাহিম লোদির নিজের আপন চাচা আলম খান লোদি সুলতানের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তাঁরা ভাবলেন, ইব্রাহিম লোদিকে জব্দ করার জন্য বাইরের কাউকে দরকার। তাঁরা কাবুলে বাবরের কাছে চিঠি পাঠালেন এবং বাবরকে ভারত আক্রমণের আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, বাবর এসে ইব্রাহিম লোদিকে হারিয়ে ধনসম্পদ লুট করে আবার কাবুলে ফিরে যাবেন, আর তাঁরা দিল্লির ক্ষমতা দখল করবেন। কিন্তু বাবর যে মনে মনে অন্য পরিকল্পনা করছিলেন, তা তাঁরা বুঝতে পারেননি।

মূল আকর্ষণ: পানিপথের যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি দুই দল (১৫২৬)

আমন্ত্রণ পেয়ে বাবর তাঁর বাহিনী নিয়ে ভারতের দিকে রওনা হন। অবশেষে ১৫২৬ সালের এপ্রিল মাসে দিল্লির কাছে পানিপথের প্রান্তরে দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো।


ইব্রাহিম লোদির দল: লোদির সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ, সাথে ছিল ১,০০০ যুদ্ধংদেহী হাতি। বিশাল বড় বাহিনী, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো শৃঙ্খলা বা আধুনিক যুদ্ধকৌশল ছিল না।

বাবরের দল: বাবরের সৈন্য ছিল মাত্র ১২,০০০ থেকে ১৫,০০০। সংখ্যার দিক থেকে বাবর অনেক পিছিয়ে ছিলেন, কিন্তু তাঁর কাছে ছিল এমন কিছু যা ভারতে আগে কেউ দেখেনি— কামান ও বারুদ।


যুদ্ধ কীভাবে হলো: বাবরের অনবদ্য কৌশল

২১শে এপ্রিল সকালে যুদ্ধ শুরু হলো। বাবর জানতেন সামনাসামনি লড়লে তিনি লোদির বিশাল বাহিনীর কাছে হেরে যাবেন। তাই তিনি দুটি বিশেষ বুদ্ধি খাটালেন:


রুমী কৌশল: বাবর ৭০০টি গরুর গাড়ি এনে চামড়ার ফিতে দিয়ে একে অপরের সাথে শক্ত করে বাঁধলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল লোদির হাতির দলকে আটকে দেওয়া। আর এই গাড়ির প্রাচীরের আড়ালে বাবর তাঁর কামানগুলো লুকিয়ে রাখলেন।

তুলঘুমা পদ্ধতি: বাবর তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীকে চার ভাগে ভাগ করলেন। লোদির সৈন্যরা যখন সোজা আক্রমণ করল, তখন বাবরের দুই পাশের দল ঘুরে গিয়ে লোদির বাহিনীকে পেছন থেকে এবং পাশ থেকে ঘিরে ফেলল।


যখন বাবরের দক্ষ গোলন্দাজ ওস্তাদ আলী এবং মুস্তফা কামান থেকে গোলা দাগা শুরু করলেন, তখন লোদির হাতিগুলো কামানের বিকট আওয়াজ আর আগুন দেখে ভয় পেয়ে গেল। তারা উল্টো ঘুরে নিজেদের সৈন্যদেরই পিষে মারতে শুরু করল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লোদির বিশাল বাহিনী তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সুলতান ইব্রাহিম লোদি যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা গেলেন।

ফলাফল: ভারতের বুকে নতুন এক যুগের জন্ম

পানিপথের এই যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে ভারতে ৩০০ বছরের পুরনো দিল্লির সুলতানি আমলের চিরতরে অবসান ঘটল। বাবর দিল্লি এবং আগ্রা জয় করে নিজেকে 'হিন্দুস্তানের সম্রাট' ঘোষণা করলেন। এভাবেই ভারতের বুকে জন্ম নিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ও সমৃদ্ধশালী সাম্রাজ্য— মুঘল সাম্রাজ্য।


Comments