মুঘল সাম্রাজ্যের আগমন (পর্ব ২): খানুয়ার যুদ্ধ এবং রানা সাঙ্গার মুখোমুখি বাবরশাহ
মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের ইতিহাসে ১৫২৬ সালের পানিপথের যুদ্ধ যদি প্রথম অধ্যায় হয়, তবে ১৫২৭ সালের খানুয়ার যুদ্ধ ছিল সেই অধ্যায়ের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং ভাগ্যনির্ধারক পর্ব। বাবরশাহ যখন দিল্লির সিংহাসনে বসলেন, তখন তিনি জানতেন যে আসল পরীক্ষা এখনও বাকি। কারণ, উত্তর ভারতের আসল শক্তি তখন দিল্লির সুলতান ছিলেন না, আসল শক্তি ছিলেন মেবারের অকুতোভয় রাজপুত রাজা রানা সংগ্রাম সিংহ, যিনি ইতিহাসে 'রানা সাঙ্গা' নামেই বেশি পরিচিত।
পানিপথের যুদ্ধের পর বাবর ভেবেছিলেন রাজপুতরা হয়তো শান্ত থাকবে। কিন্তু রানা সাঙ্গার পরিকল্পনা ছিল অন্যরকম। তিনি আফগান লোদি বংশের অবশিষ্টাংশ এবং অন্যান্য রাজপুত রাজাদের সাথে নিয়ে একটি বিশাল জোট তৈরি করেন। লক্ষ্য একটাই—বিদেশি বাবরকে এদেশ থেকে তাড়ানো।
রাজপুতদের ভয় এবং বাবরের মরণ-পণ লড়াই
খানুয়ার যুদ্ধের আগে বাবরের বাহিনী মানসিকভাবে প্রায় ভেঙে পড়েছিল। রানা সাঙ্গার বীরত্ব এবং রাজপুত সেনাদের রণকৌশল নিয়ে মুঘল শিবিরে রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তার ওপর এক জ্যোতিষী এসে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে, এই যুদ্ধে বাবরের পরাজয় নিশ্চিত। সেনাদের এই মনোবলহীন অবস্থা দেখে বাবর বুঝতে পারলেন, এখন শুধু অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ জেতা যাবে না, দরকার মানসিক শক্তির।
ঠিক এই সংকট মুহূর্তে বাবর এক ঐতিহাসিক কৌশল অবলম্বন করলেন। তিনি তার সেনাদের সামনে দাঁড়িয়ে এক আবেগঘন বক্তৃতা দিলেন। বাবর ঘোষণা করলেন, এই যুদ্ধ কোনো সাধারণ রাজ্য জয়ের যুদ্ধ নয়, এটি এক 'জিহাদ'। তিনি নিজে মদ খাওয়ার সমস্ত পাত্র ভেঙে ফেললেন এবং প্রতিজ্ঞা করলেন যে জীবনে আর কোনোদিন মদ ছোঁবেন না। তিনি তার সেনাদের মনে বোঝাতে সক্ষম হলেন যে—যুদ্ধে জিতলে তারা হবে 'গাজী' আর মরলে 'শহীদ'। বাবরের এই ম্যাজিক বক্তৃতায় মুঘল সেনাদের ঝিমিয়ে পড়া রক্ত আবার গরম হয়ে উঠল।
যুদ্ধের ময়দান: ১৫২৭ সালের ১৭ মার্চ
আগ্রা থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে খানুয়া নামক প্রান্তরে দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো। রানা সাঙ্গার বাহিনী আকারে ছিল বাবরের চেয়ে অনেক বড়। কিন্তু বাবরের কাছে ছিল দুটি তুরুপের তাস—উন্নত কামান আর 'তুঘলমা' রণকৌশল যা তিনি পানিপথের যুদ্ধেও ব্যবহার করেছিলেন।
যুদ্ধ শুরু হতেই রাজপুতরা তাদের চিরাচরিত সাহসিকতা নিয়ে মুঘলদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু মুঘলদের কামান আর বারুদের আগুনের সামনে তলোয়ার আর ঘোড়সওয়ারদের ঐতিহ্যবাহী লড়াই বেশিক্ষণ টিকতে পারছিল না। কামানের গর্জনে রাজপুতদের হাতিগুলো ভয় পেয়ে নিজেদের সৈন্যদলকেই পিষে মারতে শুরু করে।
যুদ্ধের মোড় পরিবর্তন এবং ফলাফল
লড়াই যখন চরম পর্যায়ে, ঠিক তখন একটি তির এসে সরাসরি রানা সাঙ্গার গায়ে লাগে এবং তিনি মারাত্মকভাবে জখম হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। সেনাপতির এই অবস্থা দেখে রাজপুত শিবিরের মনোবল ভেঙে যায়। রাজাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হলেও, তার অনুপস্থিতি রাজপুতদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।
এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগান বাবর। বিকেল হতে হতে খানুয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় মুঘলদের হাতে। বাবর এই যুদ্ধে এক চূড়ান্ত এবং ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করেন।
এই যুদ্ধের গুরুত্ব
খানুয়ার যুদ্ধ ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত শক্ত করার আসল চাবিকাঠি। পানিপথের যুদ্ধ বাবরকে দিল্লির সিংহাসন দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু খানুয়ার যুদ্ধ তাকে উত্তর ভারতের অবিসংবাদিত শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এই যুদ্ধের পরই বাবর আনুষ্ঠানিকভাবে 'গাজী' উপাধি ধারণ করেন। রানা সাঙ্গার পরাজয়ের মাধ্যমে রাজপুতদের দিল্লি পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন চিরতরে ভেঙে যায় এবং ভারতে মুঘলদের প্রায় ৩০০ বছরের শাসনের রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যায়।
Comments
Post a Comment