মুঘল সাম্রাজ্যের আগমন (পর্ব ৩): ঘর্ঘরার যুদ্ধ এবং বাবরের জীবনের শেষ দিনগুলো

পানিপথ ও খানোয়ার পর ভারতের মাটি তখনো পুরোপুরি মুঘলদের মুঠোয় আসেনি। দিল্লির সিংহাসন হারালেও পূর্ব ভারতের আফগানরা তখনও সুযোগ খুঁজছিল ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার। বিশেষ করে বিহার ও বাংলার সুলতানেরা একজোট হয়ে বাবরের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এই রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর ক্ষমতার লড়াইয়ের শেষ অঙ্কটাই রচিত হয়েছিল ঘর্ঘরা নদীর তীরে।

ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯ খ্রিস্টাব্দ): বাবরের শেষ মহ রণক্ষেত্র

যুদ্ধের পটভূমি ও জোট গঠন

খানোয়ার যুদ্ধে রাজপুতদের দমানোর পর বাবর লক্ষ্য করলেন যে পূর্ব দিকে আফগানরা আবার সংগঠিত হচ্ছে। সুলতান ইব্রাহিম লোদির ভাই মাহমুদ লোদি নিজেকে দিল্লির বৈধ উত্তরাধিকারী দাবি করে বিহারে আফগানদের একজোট করেন। এই আফগান জোটকে পেছন থেকে সরাসরি মদদ দিচ্ছিলেন বাংলার সুলতান নুসরত শাহ। বাবর বুঝতে পেরেছিলেন, ভারতের পূর্ব সীমান্ত সুরক্ষিত না করতে পারলে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত কোনোদিনই মজবুত হবে না। তাই ১৫২৯ সালের শুরুর দিকে তিনি সশরীরে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে পূর্ব দিকে রওনা হন।

জল ও স্থলের অদ্ভুত রণকৌশল

১৫২৯ সালের ৬ মে, বর্তমান বিহারের সারন জেলার কাছাকাছি গঙ্গা ও তার উপনদী ঘর্ঘরার মিলনস্থলে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এই যুদ্ধটি অত্যন্ত অনন্য, কারণ এটিই ছিল প্রথম যুদ্ধ যা একাধারে স্থলভাগ এবং জলভাগ —দুই জায়গাতেই সমান তালে লড়া হয়েছিল।

আফগান ও বাঙালি সৈন্যরা নদীপথে নৌকা নিয়ে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। কিন্তু বাবর তার চিরচেনা সামরিক দূরদর্শিতা ও আধুনিক প্রযুক্তির মিশেলে এক কৌশল অবলম্বন করলেন। তিনি তার বাহিনীকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করলেন:


একদল সৈন্যকে নদী পার করে শত্রুর পেছন দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

বাবর নিজে নদীর এপার থেকে কামান ও গোলন্দাজ বাহিনীর দায়িত্ব নেন।

মুঘলদের শক্তিশালী তোপধ্বনি আর নৌকার ওপর বসানো বন্দুকের গোলার সামনে আফগানদের প্রতিরোধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।


যুদ্ধের ফলাফল ও মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি

কয়েক ঘণ্টার তীব্র লড়াইয়ের পর বাবর এক নির্ণায়ক বিজয় লাভ করেন। মাহমুদ লোদি রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে যান এবং আফগানদের সম্মিলিত শক্তি চিরতরে ভেঙে পড়ে। বাংলার সুলতান নুসরত শাহ পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বাবরের সাথে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে ঠিক হয় যে নুসরত শাহ আর কখনো বাবরের শত্রুদের নিজের রাজ্যে আশ্রয় দেবেন না। ঘর্ঘরার এই জয়ের ফলে উত্তর ভারত ছাড়িয়ে বিহার পর্যন্ত মুঘলদের একক আধিপত্য সু-প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই ছিল বাবরের জীবনের শেষ বড় সামরিক অভিযান।

বাবরের জীবনের শেষ দিনগুলো ও রহস্যময় মৃত্যু

ঘর্ঘরার যুদ্ধের পর বাবর একটা স্থিতিশীল সাম্রাজ্য পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তা উপভোগ করার মতো সময় বা শারীরিক অবস্থা তাঁর ছিল না। বছরের পর বছর ধরে অবিরাম যুদ্ধ, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে তাঁর শরীর ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছিল। ১৫৩০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি আগ্রা -য় ফিরে আসেন।

পুত্রের জন্য পিতার আত্মত্যাগ: এক অলৌকিক উপাখ্যান

১৫৩০ সালের শরৎকালে বাবরের সবচেয়ে প্রিয় বড় ছেলে হুমায়ুন মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। দিল্লির সেরা হেকিম ও কবিরাজরা যখন আশা ছেড়ে দিলেন, তখন এক আবেগঘন ঘটনার অবতারণা হয়। ইতিহাস বিদদের একাংশ এবং 'হুমায়ুননামা'র বিবরণ অনুযায়ী, বাবর তাঁর ছেলের বিছানার চারপাশে ঘুরে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন: "হে আল্লাহ, হুমায়ুনের বদলে তুমি আমার জীবন কেড়ে নাও, কিন্তু ওকে সুস্থ করে দাও।"

লোককথা ও সমসাময়িক বিবরণী বলে, এই প্রার্থনার পর থেকেই হুমায়ুন আস্তে আস্তে সুস্থ হতে শুরু করেন এবং অলৌকিকভাবে বাবরের শরীর দ্রুত খারাপ হতে থাকে।

শেষ বিদায় ও অন্তিম ইচ্ছা

অবশেষে ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বর, মাত্র ৪৭ বছর বয়সে আগ্রার প্রাসাদে জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি হুমায়ুনকে তাঁর উত্তরসূরি ঘোষণা করে যান এবং ভাইদের সাথে ভালো আচরণ করার উপদেশ দেন।

মৃত্যুর পর বাবরকে প্রথমে আগ্রার 'আরামবাগ'-এ দাফন করা হয়েছিল। তবে বাবরের মন সবসময় পড়ে থাকত কাবুলের পাহাড়ি উপত্যকা আর ফলের বাগানগুলোর মাঝে। তিনি তাঁর আত্মজীবনী 'বাবরনামা'-তে লিখে গিয়েছিলেন, যেন তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে কাবুলেই সমাহিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে শের শাহ সুরির রাজত্বকালে তাঁর সেই শেষ ইচ্ছা পূরণ করা হয় এবং তাঁর মরদেহ আগ্রা থেকে নিয়ে গিয়ে কাবুলের 'বাগ-ই-বাবর' -এ পুনরায় দাফন করা হয়, যেখানে আজ ও তিনি শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন।

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর হয়তো ভারতে মাত্র চার বছর রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পানিপথ থেকে শুরু করে ঘর্ঘরা নদী পর্যন্ত তিনি যে সামরিক ভিত তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন, তারই ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীকালে তাঁর বংশধরেরা প্রায় ৩০০ বছর ভারতবর্ষ শাসন করেছিল।

Comments