মুঘল সাম্রাজ্যের আগমন (পর্ব ৫): শেরশাহ সূরীর উত্থান এবং হুমায়ুনের ভারত ত্যাগ

বাবরের তৈরি করে যাওয়া মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তিটা যে কতটা নড়বড়ে ছিল, তা বোঝা যায় তাঁর ছেলে হুমায়ুন সিংহাসনে বসার পর। সিংহাসন তো পেলেন, কিন্তু চারপাশের শত্রু আর নিজের কিছু ভুলের কারণে হুমায়ুনকে এমন এক ঝড়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, যা তাকে প্রায় নিঃস্ব করে দেয়। আর এই ঝড়ের নাম ছিল— শেরশাহ সূরী।


এক জাদুকরী উত্থান: ফরিদ থেকে 'শের খাঁ'

শেরশাহের আসল নাম কিন্তু শেরশাহ ছিল না, তাঁর নাম ছিল ফরিদ খাঁ। বিহারের এক জাঁদরেল আফগান জায়গিরদারের ছেলে ছিলেন তিনি। সৎ মায়ের অত্যাচারে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে জৌনপুরে পড়াশোনা করেন। প্রশাসনিক কাজে তিনি জন্মগতভাবেই দক্ষ ছিলেন।

কথিত আছে, একবার বিহারের সুলতানের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে তিনি খালি হাতে একটি বাঘ মেরে ফেলেছিলেন। সেই থেকে তাঁর নাম হয় 'শের খাঁ'। বাঘের মতোই চতুর আর সাহসী এই মানুষটি মনে মনে স্বপ্ন দেখতেন একদিন মুঘলদের ভারত থেকে তাড়াবেন। আর সেই সুযোগটাই তিনি পেয়ে গেলেন হুমায়ুনের দুর্বলতার কারণে।

হুমায়ুনের ভুল এবং শের শাহের চাল

বাবর মারা যাওয়ার পর ১৫৩০ সালে হুমায়ুন যখন দিল্লির সিংহাসনে বসেন, তখন তাঁর সামনে ছিল চারদিকের বিশৃঙ্খলা। গুজরাটের বাহাদুর শাহ আর অন্যদিকে বিহার-বাংলার আফগান নেতা শের খাঁ— দুজনেই ছিলেন বিপজ্জনক।

হুমায়ুন শের খাঁকে কিছুটা হালকাভাবে নিয়েছিলেন। ১৫৩৯ সালে বিহারের চৌসার যুদ্ধে শের খাঁ তাঁর আসল রূপ দেখান। বর্ষার রাতে মুঘল শিবিরে আচমকা আক্রমণ করে বসেন তিনি। এই আকস্মিক হামলায় মুঘল বাহিনী সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। হুমায়ুন কোনোমতে নিজের ঘোড়া নিয়ে গঙ্গা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে এক ভিস্তির সাহায্যে প্রাণ বাঁচান। এই জয়ের পর শের খাঁ নিজের নাম বদলে রাখেন 'শেরশাহ সূরী' এবং নিজেকে স্বাধীন সুলতান ঘোষণা করেন।

কনৌজের যুদ্ধ: মুঘলদের চূড়ান্ত বিপর্যয়

চৌসার যুদ্ধে হেরেও হুমায়ুনের চোখ খোলেনি। তিনি ভাইদের সাহায্য চাইলেন, কিন্তু ভাইয়েরা পাশে দাঁড়ানোর বদলে বিশ্বাসঘাতকতা করল। ভাঙা মন আর অগোছালো সেনাবাহিনী নিয়ে ১৫৪০ সালে হুমায়ুন আবার শেরশাহের মুখোমুখি হলেন কনৌজের যুদ্ধে।

এবার শেরশাহ হুমায়ুনকে কোনো সুযোগই দিলেন না। মুঘল বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়াতেই পারল না। শেরশাহের সুশৃঙ্খল আফগান বাহিনীর সামনে মুঘলরা খড়কুটোর মতো উড়ে গেল। দিল্লি আর আগ্রার নিয়ন্ত্রণ চলে গেল শেরশাহের হাতে। অবসান হলো মুঘল শাসনের প্রথম অধ্যায়ের, আর শুরু হলো সূর সাম্রাজ্যের গৌরবোজ্জ্বল পাঁচ বছর।

হুমায়ুনের ভারত ত্যাগ এবং যাযাবর জীবন

কনৌজের যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর হুমায়ুনের পায়ের নিচে আর কোনো মাটি ছিল না। নিজের রাজধানী ছেড়ে প্রাণভয়ে তাকে পালাতে হলো। শুরু হলো এক দীর্ঘ, যন্ত্রণাদায়ক যাযাবর জীবন।

দিল্লি থেকে সিন্ধু, সিন্ধু থেকে মারওয়ার— মাথার ওপর ছাদ নেই, সাথে বিশ্বস্ত অল্প কিছু অনুচর। এই চরম দুর্দশার মধ্যেই সিন্ধুর অমরকোটে মরুভূমির এক দুর্গে জন্ম নেয় তাঁর পুত্র আকবর, যিনি পরবর্তীতে ভারতের মহান সম্রাট হয়েছিলেন। কিন্তু তখন হুমায়ুন জানতেন না তাঁর ভাগ্যে কী আছে। শেষমেশ ভারতে কোনো আশ্রয় না পেয়ে হুমায়ুন পারস্যের সাফাভী বংশের শাসক শাহ তাহমাস্পের দরবারে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। ১৫৪০ সালে হুমায়ুনের এই দেশত্যাগ মুঘল ইতিহাসকে এক দীর্ঘ ১৫ বছরের নির্বাসনে ঠেলে দেয়।


শেরশাহ সূরীর উত্থান কোনো ভাগ্যের জোরে হয়নি, হয়েছিল তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর রণকৌশলের কারণে। অন্যদিকে হুমায়ুনের উদারতা এবং দূরদর্শিতার অভাব তাকে সিংহাসনচ্যুত করেছিল।


Comments