মুঘল সাম্রাজ্যের আগমন (পর্ব ৬): পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ এবং বৈরাম খানের ভূমিকা

মুঘল ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আকবরের নাম যতটাই উজ্জ্বল, তার পেছনের শক্ত ভিতটি গড়ে তোলার পেছনে বৈরাম খানের অবদান ততটাই গভীর। পানিপথের প্রথম যুদ্ধ যেখানে ভারতে মুঘল শাসনের সূচনা করেছিল, সেখানে ১৫৫৬ সালের পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ মুঘল সাম্রাজ্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করে পুনরায় শক্ত পায়ে দাঁড় করিয়েছিল।


এক সংকটাপন্ন মুঘল রাজ সিংহাসন


১৫৫৬ সালের জানুয়ারি মাসে দিল্লির পুরাণো কেল্লার সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে সম্রাট হুমায়ুন হঠাৎ মারা যান। সে সময় মাত্র ১৩ বছর বয়সী আকবর কালানৌরে অবস্থান করছিলেন। শিশু আকবরের মাথায় তখন রাজমুকুট উঠলেও মুঘল রাজত্ব ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর।


অন্যদিকে, সুর সাম্রাজ্যের হিন্দু সেনাপতি ও প্রধানমন্ত্রী  হেমাচন্দ্র বিক্রমাদিত্য ছিলেন এক অদম্য যোদ্ধা। হুমায়ুনের মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে হিমু একে একে গোয়ালিয়র ও আগ্রা জয় করেন এবং মুঘল বাহিনীকে পরাজিত করে দিল্লি দখল করে নেন। তিনি 'রাজা বিক্রমাদিত্য' উপাধি ধারণ করে দিল্লির সিংহাসনে বসেন। তখন মুঘল সাম্রাজ্য কার্যত দিল্লি ও আগ্রা থেকে সম্পূর্ণ বিতাড়িত।


বৈরাম খানের অটল সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব


হিমুর এই অবিশ্বাস্য উত্থানে আকবরের দরবারের অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেক মুঘল সর্দার ও উপদেষ্টা পরামর্শ দিয়েছিলেন পিছু হটে কাবুলে ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আকবরের অভিভাবক ও সেনাপতি বৈরাম খান খানের খানান সেই প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।


তিনি জানতেন, একবার পিছু হটলে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের স্বপ্নের সেখানেই ইতি ঘটবে। তিনি তরুণ আকবরকে সঙ্গে নিয়ে হিমুর মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সৈন্যবাহিনী গুছিয়ে পানিপথের ঐতিহাসিক প্রান্তরের দিকে রওনা হন।


১৫৫৬ সাল : পানিপথের রণক্ষেত্র ও রণকৌশল


১৫৫৬ সালের ৫ই নভেম্বর পানিপথের প্রান্তরে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। হিমুর বাহিনী ছিল সংখ্যায় বহু গুণ ভারী, বিশেষ করে তার শক্তিশালী প্রায় ১,৫০০ যুদ্ধ হাতি মুঘলদের কাঁপিয়ে দিয়েছিল।


যুদ্ধের শুরুতে হিমুর বাহিনী মুঘলদের ডান ও বাম দিক ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং জয়ের একদম কাছাকাছি পৌঁছে যায়। কিন্তু বৈরাম খানের দূরদর্শী রণকৌশল এবং তীরন্দাজ বাহিনীর সঠিক ব্যবহার খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।


ঐতিহাসিক সেই তীর: যুদ্ধের এক সংকট মুহূর্তে হিমু যখন হাতির পিঠে উঠে নিজের বাহিনীকে পরিচালনা করছিলেন, তখন একটি মুঘল তীর হঠাৎ এসে সরাসরি হিমুর চোখে বিঁধে যায়।

বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয়: সেনাপতি আঘাত পেয়ে সংজ্ঞা হারাতেই হিমুর বাহিনীর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। যা মুহূর্তের মধ্যে সুসংগঠিত মুঘল আক্রমণ প্রতিরোধে ব্যর্থ হয় এবং বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।


যুদ্ধের পর মূর্ছিত হিমুকে বৈরাম খানের সামনে আনা হয় এবং তাকে হত্যা করা হয়। কিছু ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, আকবরকে দিয়ে প্রতীকীভাবে তলোয়ার স্পর্শ করানোর পর বৈরাম খানই তার শিরচ্ছেদ করেন।


বৈরাম খানের ভূমিকা: সাম্রাজ্যের প্রকৃত রক্ষক


পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে বৈরাম খানের ভূমিকা শুধু একজন সেনাপতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না:


রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: আকবরের নাবালকত্বকালে বৈরাম খান ‘উকিল’ হিসেবে রাজ্য পরিচালনা করেন এবং বিরোধীদের শক্ত হাতে দমন করেন।

সাম্রাজ্যের বিস্তার: পানিপথ জয়ের পর তিনি দিল্লি ও আগ্রা পুনরুদ্ধার করেন এবং গোয়ালিয়র, জৌনপুর ও আজমির মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।

সুর বংশের চূড়ান্ত পতন: হিমুর পতনের মধ্য দিয়ে সুর বংশের পুনরুত্থানের সব সম্ভাবনা চিরতরে শেষ হয়ে যায়।


যুদ্ধের ঐতিহাসিক তাৎপর্য


পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ যদি মুঘলরা হেরে যেত, তবে হয়তো ভারতের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো—হয়তো মুঘল সাম্রাজ্যের অধ্যায় সেখানেই শেষ হয়ে যেত এবং একটি হিন্দু সুর সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হতো। কিন্তু বৈরাম খানের সাহসিকতা ও নিখুঁত নেতৃত্বের কারণে আকবর একটি শক্ত ভিত্তি খুঁজে পান, যার ওপর দাঁড়িয়ে তিনি পরবর্তী সময়ে এক বিশাল ও সুসংগঠিত মুঘল সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

Comments