মুঘল সাম্রাজ্যের আগমন (পর্ব ৭): সম্রাট আকবরের সিংহাসন ও বৈরাম খানের পতন
সম্রাট আকবরের সিংহাসন লাভ এবং বৈরাম খানের পতন ছিল মুঘল ইতিহাসের অন্যতম একটি নাটকীয় অধ্যায়। ১৫৫৬ সালে সম্রাট হুমায়ুনের আকস্মিক মৃত্যুর পর মাত্র ১৩ বছর বয়সে আকবর সিংহাসনে বসেন। নাবালক সম্রাটের অভিভাবক এবং মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান সেনাপতি হিসেবে শাসনভার নিজের হাতে নেন বৈরাম খান। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই ক্ষমতার এই সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যায়।
সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণ (১৫৫৬)
১৫৫৬ সালের জানুয়ারি মাসে দিল্লির পুরানো কেল্লার লাইব্রেরির সিঁড়ি থেকে পড়ে সম্রাট হুমায়ুন মারা যান। সেই সময় আকবর এবং বৈরাম খান পাঞ্জাবের কালানৌর নামক জায়গায় সিকান্দার শাহ সুরির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন। হুমায়ুনের মৃত্যুর খবর পেয়ে বৈরাম খান কালানৌর নামক স্থানেই ইট দিয়ে একটি অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করে মাত্র ১৩ বছর বয়সে আকবরকে মুঘল সম্রাট ঘোষণা করেন।
নাবালক আকবরের জন্য তখন দিল্লি ও আগ্রার সিংহাসন ধরে রাখা সহজ ছিল না। এই কঠিন সময়ে আফগান সেনাপতি হিমু দিল্লি আক্রমণ করে দখল করে নেন। ১৫৫৬ সালের নভেম্বর মাসে পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে বৈরাম খানের দূরদর্শী নেতৃত্বে মুঘল বাহিনী হিমুকে পরাজিত করে এবং মুঘল সাম্রাজ্য নতুন করে জীবন ফিরে পায়।
অভিভাবক হিসেবে বৈরাম খানের দাপট
সিংহাসন উদ্ধারের পর আকবরের রাজকীয় অভিভাবক বা 'খান-ই-খানান' হিসেবে বৈরাম খান সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। টানা চার বছর ১৫৫৬ থেকে ১৫৬০ তিনি কার্যত একক ক্ষমতায় সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে বৈরাম খানের কিছু সিদ্ধান্ত এবং অতিরিক্ত কঠোর মনোভাব মুঘল দরবারে তাঁর অনেক শত্রু তৈরি করে:
একচেটিয়া ক্ষমতা: রাজপরিবারের অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বৈরাম খানের এই একক দাপট ও সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছিলেন না।
শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব: বৈরাম খান নিজে ছিলেন শিয়া মুসলিম, অন্যদিকে মুঘল দরবারের বেশিরভাগ কর্মকর্তা ছিলেন সুন্নি। তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ শিয়া অনুসারীদের বড় বড় পদে বসাতে শুরু করলে দরবারে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
কঠোর শাস্তি: ছোটখাটো ভুলের জন্য তিনি রাজকীয় হাতিচালক বা বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের মৃত্যুদণ্ড দিতেও দ্বিধা করতেন না, যা আকবরকেও ক্ষুব্ধ করেছিল।
বৈরাম খানের পতনের কারণ ও ষড়যন্ত্র
আকবর যখন ১৮ বছরে পা দিলেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে তিনি কেবল নামেই সম্রাট, আসল ক্ষমতা বৈরাম খানের হাতে। এই সময় আকবরের ধাত্রী মা মাহাম অনগা, হামিদা বানু বেগম এবং দরবারের কিছু অভিজাত ব্যক্তি বৈরাম খানের বিরুদ্ধে আকবরের কান ভারী করতে শুরু করেন। ইতিহাসে একে "পর্দা শাসন"-এর সময়ও বলা হয়ে থাকে।
তারা আকবরকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, বৈরাম খান এভাবে ক্ষমতা ধরে রাখলে আকবর কখনোই স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে পারবেন না।
ক্ষমতা দখল ও বৈরাম খানের বিদায় (১৫৬০)
১৫৬০ সালের মার্চ মাসে আকবর শিকারের বাহানা করে আগ্রা থেকে দিল্লি চলে আসেন। দিল্লিতে পৌঁছে তিনি বৈরাম খানের সমস্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা কেড়ে নেন এবং ঘোষণা করেন যে এখন থেকে তিনি নিজেই সাম্রাজ্য পরিচালনা করবেন।
আকবর বৈরাম খানকে একটি চিঠি পাঠিয়ে তিনটি বিকল্প পথ দেন:
রাজদরবারে কোনো অঞ্চলের ছোটখাটো দায়িত্ব বা জায়গিরদারি নেওয়া।
সম্রাটের ব্যক্তিগত ধর্মীয় ও গুপ্তচর উপদেষ্টা হিসেবে থাকা।
পবিত্র মক্কা নগরীতে হজে চলে যাওয়া।
অভিমানী বৈরাম খান মক্কায় যাওয়ার পথটাই বেছে নেন। তবে যাওয়ার পথে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি পাঞ্জাবে ছোটখাটো একটি বিদ্রোহ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু আকবরের বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে তিনি আত্মসমর্পণ করেন। আকবর তাঁর পুরোনো অভিভাবককে ক্ষমা করে দেন এবং মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা করে দেন।
বৈরাম খানের করুণ পরিণতি (১৫৬১)
১৫৬১ সালের জানুয়ারি মাসে মক্কায় যাওয়ার পথে গুজরাটের পাটান নামক স্থানে মুবারক খান লোহানি নামের এক আফগান যুবকের হাতে বৈরাম খান নিহত হন। পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে বৈরাম খানের নির্দেশে এই আফগানের বাবা নিহত হয়েছিলেন, সেই পুরোনো প্রতিশোধ নিতেই সে বৈরাম খানকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে।
বৈরাম খানের মৃত্যুর পর আকবর তাঁর স্ত্রী সলিমা সুলতান বেগমকে বিয়ে করেন এবং বৈরাম খানের ৪ বছরের ছোট ছেলে আব্দুর রহিমকে নিজের সন্তানের মতো বড় করেন। এই রহিমই পরবর্তীতে আকবরের দরবারের বিখ্যাত কবি ও সেনাপতি 'আব্দুর রহিম খান-ই-খানান' হিসেবে পরিচিত হন।
বৈরাম খানের পতন মুঘল ইতিহাসের একটি মোড় পরিবর্তন। এর মাধ্যমেই আকবর একজন অভিভাবকের ছায়া থেকে বেরিয়ে সত্যিকারের 'স্বাধীন সম্রাট' হিসেবে নিজের শাসনকাল শুরু করেন।
Comments
Post a Comment