মুঘল সাম্রাজ্যের আগমন (পর্ব ১০): 'দ্বীন-ই-ইলাহী' এবং আকবরের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি
মুঘল বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট জালালউদ্দিন মুহাম্মদ আকবর কেবল সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্যই ইতিহাসে স্মরণীয় নন, বরং তাঁর প্রগতিশীল ও উদার ধর্মীয় চিন্তাভাবনার জন্য তিনি মধ্যযুগীয় বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছেন। একটি বহু-ধর্ম ও বহু-সংস্কৃতির দেশে স্থায়ী শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি যে ধর্মীয় সমন্বয়বাদের নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তারই চূড়ান্ত রূপ ছিল ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’।
আকবরের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিবর্তন ও ইবাদত খানা
সিংহাসনে বসার পর আকবর উপলব্ধি করেছিলেন যে, ভারতের মতো একটি বিশাল হিন্দুপ্রধান দেশে শুধু তরবারির জোরে শাসন চালানো সম্ভব নয়। এই উদ্দেশ্যে তিনি ১৫৭৫ সালে ফতেহপুর সিকরিতে ‘ইবাদত খানা’ গৃহ নির্মাণ করেন।
শুরুতে এখানে কেবল সুন্নি মুসলিম উলেমাদের ধর্মীয় আলোচনার সুযোগ ছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে উলেমাদের অভ্যন্তরীণ কাদা-ছোড়াছুড়ি এবং গোঁড়ামি দেখে আকবর হতাশ হন।
১৫৭৮ সালে তিনি ইবাদতখানার দুয়ার হিন্দু, জৈন, খ্রিস্টান, পার্সী এবং শিখসহ সব ধর্মের পণ্ডিতদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। বিভিন্ন ধর্মের সারকথা শোনার পর আকবরের মনে বিশ্বাস জন্মায় যে, সত্য কোনো একক ধর্মের একচেটিয়া অধিকার নয়, বরং সব ধর্মেই ভালো কিছু না কিছু বাণী রয়েছে।
'সুলহ-ই-কুল' বা সর্বজনীন শান্তি
বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের সাথে আলোচনার পর আকবর ‘সুলহ-ই-কুল’ বা ‘সবার জন্য শান্তি ও সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করেন। এটি ছিল এমন এক আদর্শ যেখানে রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের পক্ষ নেবে না এবং সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে। এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই তিনি অমুসলিমদের ওপর থেকে বৈষম্যমূলক ‘জিজিয়া কর’ এবং তীর্থযাত্রী কর তুলে নেন।
'দ্বীন-ই-ইলাহী'র সূচনা ও মূল কথা (১৫৮২ খ্রিস্টাব্দ)
ধর্মীয় চরমপন্থা দূর করতে এবং সাম্রাজ্যের সব ধর্মের মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে আকবর ১৫৮২ সালে একটি নতুন জীবনদর্শন সূচনা করেন, যা ইতিহাসে ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’ বা ‘তাওহিদ-ই-ইলাহী’ নামে পরিচিত।
এটি আসলে কোনো নতুন প্রথাগত ধর্ম ছিল না, বরং বিভিন্ন ধর্মের ভালো নীতিগুলোর একটি চমৎকার সংমিশ্রণ বা নৈতিক আচরণবিধি ছিল।
এই মতবাদের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল:
একেশ্বরবাদ: দ্বীন-ই-ইলাহীর মূল ভিত্তি ছিল এক ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস। সম্রাট আকবরকে এই দর্শনের প্রধান আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে গণ্য করা হতো।
সহনশীলতা ও অহিংসা: এই মতাদর্শে প্রাণিহত্যা নিরুৎসাহিত করা হতো এবং নিরামিষ ভোজনের ওপর জোর দেওয়া হতো। বিশেষ করে নিজের জন্মমাসে আকবর মাংস খাওয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছিলেন।
নৈতিক আচরণবিধি: এর অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় ‘আল্লাহু আকবর’ এবং ‘জিল্লা জালালুহু’ বলার নিয়ম ছিল। দানশীলতা, অহংকার বর্জন এবং পবিত্র জীবনযাপন ছিল এর মূল শর্ত।
সূর্য ও অগ্নির প্রতি শ্রদ্ধা: পার্সী ধর্মের প্রভাবে এই মতবাদে আলো, অগ্নি এবং সূর্যকে ঈশ্বরের শক্তির প্রতীক হিসেবে সম্মান জানানো হতো।
দ্বীন-ই-ইলাহী কি একটি নতুন ধর্ম ছিল
ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বীন-ই-ইলাহীর প্রকৃতি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। সমসাময়িক গোঁড়া ঐতিহাসিক আবদুল কাদির বাদায়ুনি এবং পর্তুগিজ জেসুইট পাদ্রিরা দাবি করেছিলেন যে, আকবর ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে নতুন ধর্ম তৈরি করেছিলেন।
তবে আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, দ্বীন-ই-ইলাহী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ছিল না। কারণ এর কোনো নির্দিষ্ট পবিত্র ধর্মগ্রন্থ, কোনো পুরোহিত শ্রেণী, মন্দির বা মসজিদ ছিল না। এটি ছিল মূলত একটি উদার নৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শন, যার উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যের অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে সম্রাটের প্রতি আনুগত্য এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখা।
দ্বীন-ই-ইলাহী-র ব্যর্থতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
আকবর কখনোই এই দর্শনটি সাধারণ মানুষের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেননি। ফলে এটি খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি। বীরবল এবং আবুল ফজলসহ সম্রাটের খুব কাছের মাত্র ১৮ থেকে ১৯ জন দরবারী এই মতাদর্শ গ্রহণ করেছিলেন। আকবরের সেনাপতি রাজা মানসিংহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি কেবল হিন্দু ও ইসলাম ধর্মকেই চেনেন, অন্য কোনো নতুন দর্শন গ্রহণ করতে তিনি রাজি নন। আকবর তাঁর এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েছিলেন। ১৬০৫ সালে আকবরের মৃত্যুর সাথে সাথেই এই মতাদর্শের অবসান ঘটে।
সম্রাট আকবরের ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’ সংখ্যাগত দিক থেকে সফল না হলেও, এর রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। মধ্যযুগের গোঁড়ামির অন্ধকার যুগে দাঁড়িয়ে আকবর যে ধর্মীয় সহনশীলতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, আকবর কেবল একজন বিজয়ী সম্রাট ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন দূরদর্শী এবং এক আধুনিক ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা।
Comments
Post a Comment