মুঘল সাম্রাজ্যের আগমন (পর্ব ১২): মুঘল আমলের রাজস্ব ব্যবস্থা ও রাজা টোডরমল
মুঘল ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তাদের শাসন আমলের অর্থনৈতিক ও রাজস্ব ব্যবস্থা। একটি বিশাল সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখা এবং সুবিশাল সেনাবাহিনী পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী কর ব্যবস্থা। মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে এই রাজস্ব ব্যবস্থাকে সবচেয়ে আধুনিক ও সুসংগঠিত রূপ দেওয়া হয়, যার নেপথ্যের প্রধান কারিগর ছিলেন তাঁর অর্থমন্ত্রী রাজা টোডরমল।
মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থার পটভূমি ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
আকবরের সিংহাসনে আরোহণের আগে ভারতের রাজস্ব ব্যবস্থা বেশ এলোমেলো ছিল। শেরশাহ শুরি কিছু ভালো সংস্কার করলেও তাঁর মৃত্যুর পর সেগুলো ভেঙে পড়ে। আকবর লক্ষ্য করেন যে, করের পরিমাণ নির্দিষ্ট না থাকায় কৃষকরা চরম দুর্ভোগে পড়তেন এবং রাজস্ব আদায়কারীরা দুর্নীতি করার সুযোগ পেত। সাম্রাজ্যকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে এবং প্রজাদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করতে একটি স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক রাজস্ব ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
রাজা টোডরমল এবং 'দহশালা' ব্যবস্থা
আকবরের 'নবরত্ন' সভার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রত্ন ছিলেন রাজা টোডরমল। শেরশাহের অধীনে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন টোডরমলকে ১৫৮২ সালে আকবর প্রধান দেওয়ান বা অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন। তিনি যে যুগান্তকারী রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তা ‘দহশালা ব্যবস্থা’ নামে পরিচিত। 'দহ' শব্দের অর্থ দশ। অর্থাৎ, এটি ছিল বিগত ১০ বছরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
রাজস্ব ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
রাজা টোডরমল অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পুরো কর ব্যবস্থাকে সাজিয়েছিলেন:
জমি জরিপ ও শ্রেণীকরণ: টোডরমল প্রথমবার বাঁশের তৈরি বিশেষ পরিমাপক শিকল (যাকে 'তণব' বলা হতো) দিয়ে জমি নিখুঁতভাবে মাপা শুরু করেন। উর্বরতা এবং ফসল উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে জমিকে চার ভাগে ভাগ করা হয়:
পোলাজ: যে জমিতে প্রতি বছর নিয়মিত চাষ হতো।
পরৌতি: উর্বরতা ফিরে পাওয়ার জন্য যে জমিকে ১-২ বছর খালি রাখা হতো।
চাচর: যে জমি ৩-৪ বছর অনাবাদী থাকত।
বাঞ্জার: ৫ বছর বা তার বেশি সময় ধরে পতিত থাকা অনুর্বর জমি।
১০ বছরের গড় উৎপাদন ও মূল্য নির্ধারণ: এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল গত ১০ বছরে ১৫৭০ থেকে ১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দ কোন জমিতে কী পরিমাণ ফসল উৎপন্ন হয়েছে এবং বাজারে তার দাম কেমন ছিল, তার একটি গড় হিসাব বের করা।
করের পরিমাণ নির্ধারণ: এই ১০ বছরের গড় উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ রাজস্ব বা কর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
নগদ টাকায় কর আদায়: মুঘল আমলে কর সাধারণত ফসলের বদলে নগদ টাকায় পরিশোধ করার নিয়ম চালু করা হয়। এর ফলে সরকারের হিসাব রাখা সহজ হতো। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে ফসলেও কর নেওয়া হতো।
দুর্নীতি রোধ ও নথিপত্র সংরক্ষণ: প্রতিটি চাষির জমির বিবরণ ও করের পরিমাণ লিখে রাখা হতো। কৃষকদের দেওয়া হতো 'পাট্টা' এবং তাদের কাছ থেকে নেওয়া হতো 'কবুলিয়ত'। এর ফলে কর্মচারীদের দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশেষ ছাড়
টোডরমলের এই ব্যবস্থা কেবল কর আদায়ের জন্যই কঠোর ছিল না, এতে মানবিক দিকও ছিল। খরা, বন্যা বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল নষ্ট হলে কৃষকদের কর মওকুফ করা হতো। এমনকি নতুন করে চাষাবাদের জন্য রাষ্ট্র থেকে কৃষকদের 'তকাভি' দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল।
রাজা টোডরমলের এই সংস্কারের গুরুত্ব ও প্রভাব
রাজা টোডরমলের এই রাজস্ব ব্যবস্থা মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এর ইতিবাচক প্রভাবগুলো ছিল নিম্নরূপ:
অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব: সাম্রাজ্যের আয়ের উৎস সুনির্দিষ্ট হওয়ায় রাজকোষ সবসময় সমৃদ্ধ থাকত, যা আকবরকে বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তারে সাহায্য করেছিল।
কৃষকদের স্বস্তি: করের হার আগে থেকে নির্দিষ্ট থাকায় কৃষকরা জানতেন তাদের কত দিতে হবে। ফলে জমিদার বা কর্মচারীদের বাড়তি জুলুম বন্ধ হয়।
কৃষির উন্নয়ন: পতিত জমি বা 'বাঞ্জার' জমিকে চাষযোগ্য করে তুললে করের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়া হতো, যা কৃষকদের নতুন জমি চাষে উৎসাহিত করে।
মুঘল আমলের রাজস্ব ব্যবস্থা কেবল কর আদায়ের মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন ভারতের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। আর রাজা টোডরমল ছিলেন সেই দূরদর্শী অর্থনীতিবিদ, যিনি মধ্যযুগীয় শাসন ব্যবস্থায় একটি আধুনিক, নিয়মতান্ত্রিক ও বিজ্ঞানসম্মত রাজস্ব কাঠামো উপহার দিয়েছিলেন। তাঁর এই সফল ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে ব্রিটিশরাও তাদের ভূমি রাজস্ব নীতি সাজিয়েছিল।
Comments
Post a Comment