মুঘল সাম্রাজ্যের আগমন (পর্ব ১৩): সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং মেহেরউন্নিসা (নূর জাহান)-র ক্ষমতা
মুঘল ইতিহাসের অন্যতম আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং তাঁর বেগম নূর জাহানের যৌথ শাসনকাল। এটি কেবল একটি প্রেমের গল্প নয়, বরং মধ্যযুগের ভারতের রাজনীতিতে একজন নারীর সর্বোচ্চ ক্ষমতা অর্জনের এক অনন্য দলিল।
মেহেরউন্নিসা থেকে 'নূর জাহান' হয়ে ওঠা
নূর জাহানের আসল নাম ছিল মেহেরউন্নিসা। তিনি ছিলেন পারস্যের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। ভাগ্য অন্বেষণে তাঁর পরিবার ভারতে আসে। প্রথমে শের আফগান নামক এক মুঘল কর্মচারীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। ১৬০৭ সালে এক সংঘর্ষে শের আফগান নিহত হলে মেহেরউন্নিসা রাজপ্রাসাদে রানীদের সেবিকা হিসেবে নিযুক্ত হন।
১৬১১ সালে মীনা বাজারে সম্রাট জাহাঙ্গীর প্রথমবার মেহেরউন্নিসাকে দেখেন এবং তাঁর রূপ ও বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রথমে ‘নূর মহল’ এবং পরে ‘নূর জাহান’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
নূর জাহানের রাজকীয় ক্ষমতা ও প্রভাব
বিয়ের পর দ্রুতই নূর জাহান মুঘল সাম্রাজ্যের পর্দার আড়ালের আসল শাসকে পরিণত হন। সম্রাট জাহাঙ্গীর শিল্পকলা ও মদ্যপানে আসক্ত থাকায় রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজের দায়িত্ব ধীরে ধীরে নূর জাহানের হাতে চলে যায়। তাঁর ক্ষমতার প্রধান দিকগুলো ছিল:
যৌথ মুদ্রা ও ফরমান: মুঘল ইতিহাসে নূর জাহানই একমাত্র সম্রাজ্ঞী, যাঁর নাম সম্রাটের সাথে রাজকীয় মুদ্রায় খোদাই করা হয়েছিল। এছাড়া সমস্ত সরকারি আদেশ বা ‘ফরমান’-এ সম্রাটের পাশাপাশি নূর জাহানের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক ছিল।
ঝরোকা দর্শন ও বিচার: সম্রাট অসুস্থ থাকলে নূর জাহান নিজেই রাজপ্রাসাদের বারান্দায় এসে প্রজাদের দর্শন দিতেন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।
কূটনৈতিক ও সামরিক দক্ষতা: তিনি শুধু ঘরের কাজেই দক্ষ ছিলেন না, বরং যুদ্ধবিদ্যা এবং শিকারেও পারদর্শী ছিলেন। তিনি বহুবার সম্রাটের সাথে শিকারে গিয়ে বাঘ মেরেছেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
'নূর জাহান জুন্টা' বা ক্ষমতা চক্র
শাসনকার্য সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নূর জাহান রাজপ্রাসাদে একটি শক্তিশালী দল বা উপদল গড়ে তোলেন, যা ইতিহাসে ‘নূর জাহান জুন্টা’ বা চক্র নামে পরিচিত। এই দলের মূল সদস্য ছিলেন চারজন:
নূর জাহান নিজে।
তাঁর পিতা গিয়াস বেগ ''ইতিমাদ-উদ-দৌলা''।
তাঁর ভাই আসফ খান।
জাহাঙ্গীরের যোগ্য পুত্র শাহজাদা খুররম ''যিনি পরে সম্রাট শাহজাহান হন''।
১৬১১ থেকে ১৬২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই জুন্টা বা চক্রটিই মূলত মুঘল সাম্রাজ্যের সমস্ত নীতি নির্ধারণ এবং উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করতো।
মহাবত খাঁর বিদ্রোহ এবং নূর জাহানের বীরত্ব
১৬২৬ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীরের এক বিশ্বস্ত সেনাপতি মহাবত খাঁ নূর জাহানের অতিরিক্ত ক্ষমতায় ক্ষুব্ধ হয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীরকে বন্দী করেন। এই চরম সংকটের মুখে নূর জাহান অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি নিজেই হাতির পিঠে চড়ে মুঘল বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে মহাবত খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। প্রথম দফায় ব্যর্থ হয়ে তিনি নিজেও বন্দী হন, কিন্তু নিজের চতুর কূটনীতির সাহায্যে তিনি মহাবত খাঁর সৈন্যদের মধ্যে ফাটল ধরান এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরকে সফলভাবে মুক্ত করে আনেন।
ক্ষমতার অবসান ও শেষ জীবন
১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর নূর জাহানের ক্ষমতার পতন ঘটে। সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্বে নূর জাহানের ভাই আসফ খান নিজের জামাতা শাহজাদ খুররমকে ''শাহজাহান'' সমর্থন করেন। রাজনীতিতে পরাজিত হয়ে নূর জাহান নিজেকে রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম থেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেন। শাহজাহান তাঁকে বার্ষিক দুই লক্ষ টাকা ভাতা মঞ্জুর করেন। জীবনের শেষ ১৮ বছর তিনি লাহোরে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করেন এবং ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
নূর জাহান ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী, পরোপকারী এবং সুশাসক। পুরুষশাসিত মুঘল দরবারে নিজের যোগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তার জোরে তিনি যেভাবে প্রায় ১৫ বছর সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন, তা ভারতের ইতিহাসে তাঁকে এক অনন্য মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।
Comments
Post a Comment